জুন ১৩, ২০২৪

আমাদের সম্পর্কে আরো জানুনঃ

আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি

উন্নয়ন ডেস্ক –

সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বাংলাদেশ যখন করোনা মোকাবিলায় হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে, তখনই স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর একের পর এক মিডিয়ায় প্রকাশিত হচ্ছে। এই দুর্নীতি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। ভুয়া করোনাভাইরাস নেগেটিভ রিপোর্ট, লাইসেন্স ছাড়াই হাসপাতালে করোনাভাইরাস চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া এবং সেখান থেকে কোটি কোটি টাকা ‘আয়’ করা, যাদের কোনো অনুমতিই নেই, তাদের দিয়ে করোনা টেস্টের নামে ‘বুথ’ তৈরি করে নমুনা সংগ্রহ করা, সবকিছু স্বাস্থ্য খাতের নানা অনিয়ম, অদক্ষতা আর দুর্নীতির চিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে। কিছুতেই যেন স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। রিজেন্ট হাসপাতাল আর জেকেজি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া সনদ-কাহিনী নিয়ে মিডিয়া যখন সোচ্চার, তখন সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে একটি সংবাদ স্বাস্থ্য খাতে পাঁচ বছরে সরকারের গচ্চা দুই হাজার কোটি টাকা। মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনার নামে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। সাহেদ, সাবরিনা-আরিফ ‘কাহিনী’ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে কথিত ‘গডফাদাররা’ এতই শক্তিশালী যে, এদের অনেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সাহেদ, সাবরিনা আর আরিফ গ্রেপ্তার হয়েছেন। দুদক সক্রিয় হয়েছে। কিন্তু যাদের সক্রিয় হওয়ার কথা, তাদের নিষ্ক্রিয়তা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এরই মধ্যে আবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবার হুমকি দিয়েছেন তাকে চাকরিচ্যুত করার অধিকার কেউ রাখেন না।

স্বাস্থ্য খাতের এই যে দুর্নীতি, এই দুর্নীতির খবর শুধু আজকেরই নয়। ৩৭ হাজার টাকায় পর্দা কেনা, পাঁচ হাজার টাকায় একটি করে বালিশ কেনার কাহিনী তো অনেক পুরনো। কোটি কোটি টাকায় কেনা মেডিকেল সরঞ্জাম বছরের পর বছর বাক্সবন্দি থেকে নষ্ট হয়ে গেছে এ ধরনের একাধিক ঘটনার সংবাদ আমরা সংবাদপত্র থেকেই পাঠ করেছি। কিন্তু ‘পর্দা ও বালিশ’ কাহিনীর সঙ্গে যারা যারা জড়িত ছিলেন, তাদের কজনকে আমরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পেরেছি? দুদক চেয়ারম্যান মাঝেমধ্যে বেশ স্পষ্ট কথা বলেন। স্বাস্থ্য খাত নিয়েও তিনি মন্তব্য করেছেন। কিন্তু আমরা জানি না স্বাস্থ্য খাতের সব দুর্নীতিবাজকে আমরা শাস্তি দিতে পারব কি না? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সাধারণ কর্মচারীর ঢাকায় একাধিক বাড়ি, কানাডায় বাড়ির খবর ছবিসহ তো সংবাদপত্রেই ছাপা হয়েছিল। মন্ত্রণালয় তাকে চাকরিচ্যুত করেছিল। কিন্তু শুধু চাকরি থেকে অপসারণ করাই কি এর সমাধান? দুদক তদন্ত করছে। তারপরও দুর্নীতির রশিটা যেন টানা যাচ্ছে না!

ঢাকা মেডিকেল কলেজের স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ২০ কোটি টাকা খরচের ব্যাপারটিও বহুল আলোচিত। ইতিমধ্যে ডিএমসির পরিচালকের একটি ব্যাখ্যাও আমরা পেয়েছি। তিনি জানিয়েছেন, এই টাকা শুধু খাওয়ার বিলই নয়, এর সঙ্গে হোটেল ভাড়া ও যাতায়াতের খরচও জড়িত এবং এটা ছিল দুই মাসের বাজেট। মোট ২২৭৬ জন কর্মীর (ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ান ও নিরাপত্তাকর্মী) জন্য এই টাকা খরচ হয়েছে। একজন ডাক্তারের জন্য প্রতিদিনের খাবার খরচ মাত্র ৫০০ টাকা! কিন্তু ২৯ জুন প্রধানমন্ত্রী যখন এই টাকা খরচের ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং ব্যাপারটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংসদে বক্তব্য দেন, তখন এটাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে অনেকগুলো প্রশ্ন, যে প্রশ্নটি তুলেছেন বিএমএর মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল চৌধুরী। কারা হোটেল ঠিক করল, কোন বিবেচনায় ওইসব হোটেল ঠিক করা হলো, ১২ কোটি টাকার হোটেল বিল, কতটুকু যৌক্তিক এই প্রশ্নই যমুনা টিভিকে করেছেন বিএমএর মহাসচিব। আমাদের এটা ভুললে চলবে না, আমাদের দেশের ডাক্তার আর নার্সরা কভিড-১৯ মোকাবিলায় সম্মুখ সমরে আছেন। তাদের মনোবলকে আমরা ভেঙে ফেলতে পারি না। পরিবার থেকে এক রকম বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। কিন্তু তাদের সামনে রেখে কিছু অসৎ লোক অবৈধ পন্থায় সরকারি অর্থের ‘ছয়-নয়’ করছেন, তা হতে পারে না। মুগদা হাসপাতালের ডাক্তারদের হোটেল বিল নিয়েও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে ব্যবহার করে কিছু অসৎ লোক অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। এদের সামাজিকভাবে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। এডিবির সহযোগিতায় ভিডিও তৈরির কাহিনীতে যে দুর্নীতি, তা কি আমরা ভুলে গেছি?

যারা এসব তদন্ত করেন, তারা একবারও ভেবে দেখেছেন কি ৩০টি ভিডিও বানাতে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচ হয় কিনা? অভিযুক্ত উক্ত প্রকল্প পরিচালককে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটাই কি সমাধান? যিনি অসৎ পথে টাকা উপার্জন করেন, তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, সেখানেও দুর্নীতি করবেন। এ-সংক্রান্ত আইনও দুর্বল। দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া যায় না। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে এরা বের হয়ে যান। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে, স্বাস্থ্য সেক্টরের দুর্নীতি উৎখাত করা যাবে না।

সাম্প্রতিক সময়ে বহির্বিশে^ বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কয়েকটি সংবাদ প্রচারিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করেছে। গত ১০ জুলাইয়ের খবর ছিল এ রকম : নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইতালি, জাপান ও কোরিয়া। অর্থাৎ এসব দেশে বাংলাদেশিরা আপাতত আর যেতে পারছেন না। কারণ ওইসব দেশে যেসব বাংলাদেশি অবস্থান করছিলেন, তারা যখন ফিরে যান, তখন তাদের শরীরে কভিড-১৯ ‘পজিটিভ’ ধরা পড়ে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইতালি নাগরিকরা করোনাভাইরাস ‘নেগেটিভ’ সার্টিফিকেট নিয়ে রোম বিমানবন্দরে অবতরণ করলে তাদের শরীরে করোনাভাইরাস ‘পজিটিভ’ ধরা পড়ে। ফলে তাদের আর ইতালি ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তাদের সবাইকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। এ ঘটনায় আকাশপথ বন্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে ইতালি আগামী ৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে আসা সব ফ্লাইটে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইতালির পর তুরস্কও ঢাকা থেকে সরাসরি ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশও বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। চীনের চায়না সাউদার্নও ঢাকায় ফ্লাইট চালাতে পারছে না। এর কারণ হিসেবে যা জানা যাচ্ছে তা হচ্ছে বাংলাদেশি যাত্রীদের কাছে ভুয়া করোনা ‘নেগেটিভ’ সনদ। এদের অনেকেই করোনা ‘পজিটিভ’ ছিল কিন্তু তারা ভুয়া করোনা ‘নেগেটিভ’ সনদ সংগ্রহ করে। বলা ভালো, ঢাকার রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে দেখতে পায় সেখান থেকে কোনো পরীক্ষা না করেই করোনাভাইরাস ‘নেগেটিভ’ রিপোর্ট দিয়েছে, শুধু টাকার বিনিময়ে। প্রায় কয়েক কোটি টাকা এভাবেই ‘আয়’ করেছে রিজেন্ট হাসপাতাল, যে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদনের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ইতালিতে ঢুকতে না দেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইতালিয়ান নাগরিকদের অনেকেই ওই হাসপাতাল থেকে ভুয়া রিপোর্ট সংগ্রহ করেছিলেন।

আমাদের ভাবনার জায়গাটা এখানেই ভুয়া সনদ আর ইমিগ্রেশন পার হওয়ার বিষয়টি। আমরা যারা নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করি, ইতালির প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য আমাদের জন্য কি কোনো শঙ্কা তৈরি করে না? লাখ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে যান, কাজ করেন, বিদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে অনেকে বিদেশে বসবাস করেন। ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক লাখ বাংলাদেশি বসবাস করেন। ইতালির ঘটনাবলি যখন বিশ্বের শীর্ষ সংবাদপত্রগুলোতে ছাপা হয়, তখন আমাদের ভাবর্মূতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? শত শত বাংলাদেশি এখন নানা জটিলতায় জড়িয়ে পড়বেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশনের কড়া নজরদারিতে এরা পড়ে যাবেন। এরা বাংলাদেশের কোনো রিপোর্টকেই আর গ্রহণ করবে না। ফলে নতুন নতুন আইন, বিধিনিষেধ আর ডিপোর্টের মুখোমুখি হবেন তারা।

করোনাভাইরাসের ভুয়া রিপোর্ট যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছাপা হয়েছে, তখন আরেকটি সংবাদও আমাদের জন্য চিন্তার কারণ। সংবাদটি হচ্ছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক ‘নোট ভারবাল’-এ বহুল আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালকে করোনা চিকিৎসার জন্য বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য ‘ডেজিগনেটেড’ বা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল (মানবজমিন, ১৪ জুলাই)। কী সাংঘাতিক কথা! যে হাসপাতালে আইসিইউ ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা মানসম্মত ছিল না, সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই হাসপাতালে বিদেশি কূটনীতিকদের চিকিৎসার কথা বলে কীভাবে? এটা কি এক ধরনের দায়িত্বহীনতা নয়? যিনি ওই নোট ভারবালটি পাঠিয়েছিলেন, তিনি কি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করলেন না? স্বাস্থ্য খাত নিঃসন্দেহে বহুল আলোচিত। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বহীনতা কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও দুর্নীতি (কুয়েতের ঘটনা), মন্ত্রী মহোদয়ের অসংলগ্ন উক্তি সবই কি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট নয়। করোনা-সংকট আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করাও প্রয়োজন, যারা দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Pinterest
Reddit