দুঃসময়ে বন্যার হানা

উন্নয়ন ডেস্ক

গবাদিপশুকে ভেলায় তুলে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাচ্ছে একটি পরিবার। সোমবার কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার নানকারগ্রাম থেকে তোলা ছবি-মমিনুল ইসলাম মঞ্জু
গবাদিপশুকে ভেলায় তুলে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাচ্ছে একটি পরিবার। সোমবার কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার নানকারগ্রাম থেকে তোলা ছবি-মমিনুল ইসলাম মঞ্জু

ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা, যমুনা, তিস্তা, পরশুরামসহ দেশের ১৪টি নদনদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। তলিয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। বিস্তীর্ণ জনপদ ডুবে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে জনজীবন। বন্যাদুর্গত ১৫ জেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন পৌনে তিন লাখ মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ১৪ লাখ। করোনার দুঃসময়ে হানা দেওয়া এ বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, গতকাল সোমবার পর্যন্ত দেশের ৮১টি উপজেলার ৪০১টি গ্রাম বন্যাদুর্গত হয়েছে। এসব এলাকায় পানিবন্দি হয়েছেন দুই লাখ ৮৩ হাজার ৬৯১। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭৭০। বন্যায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটের পাশাপাশি গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন পানিবন্দি মানুষ।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, রাজবাড়ী এবং নাটোরে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। কিছুটা উন্নতি হতে পারে নীলফামারী, লালমনিরহাট এবং রংপুরে। অন্যদিকে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা এবং ফেনী জেলায় বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হতে পারে। চলতি মাসে এক বা দুটি বর্ষাকালীন লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে একটি নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে উত্তর, উত্তর-মধ্যাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মধ্যমেয়াদি এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যাদুর্গত ১৫টি জেলায় সোমবার পর্যন্ত ৯৭৫টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তবে সেখানে যেতে অনাগ্রহী মানুষ। এ পর্যন্ত মাত্র ১৫ হাজার ২৪০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। এসব জেলায় ৫৮৫টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬৫টি চালু করা হয়েছে। বন্যাদুর্গতদের মধ্যে নগদ অর্থ, ত্রাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র বিতরণ করা হচ্ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর- লালমনিরহাট :লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। তিস্তা ও ধরলার ক্রমাগত পানি বৃদ্বির ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। টানা চার দিন ধরে পানি বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় রোববার মধ্যরাতে ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তার পানি সর্বোচ্চ বিপদসীমা ৫৭ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ফলে ব্যারাজ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় রেড অ্যালার্ট (জরুরি সতর্কতা) জারি করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। উজান ও ভাটি এলাকায় বসবাসরত লোকজনকে নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য সর্তকতামূলক প্রচার চালায় ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ। ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ থেকে ধেয়ে আসা পানি নিয়ন্ত্রণ করতে দেশের সর্ব বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ফ্ল্যাট বাইপাস রাতেই কেটে বা খুলে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে শেষ রাতের দিকে ব্যারাজ পয়েন্টে পানি কিছুটা কমলে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে কর্তৃপক্ষ।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, গত দু’দিন থেকে সর্তকতা জারি করে উজান ও ভাটিতে থাকা চরাঞ্চলের মানুষজনকে নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। ব্যারাজ রক্ষার্থে প্রয়োজনে ফ্ল্যাট বাইপাস খুলে দেওয়ার কথা জানান তিনি।

এদিকে সদর উপজেলার মোগলহাটের শিমুলবাড়ি পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সদর উপজেলার মোগলহাট ও কুলাঘাট ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

এছাড়া আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও সদর উপজেলার ১২ ইউনিয়নের প্রায় ৩৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ও আঙ্গোরপোতা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ডুবে গেছে। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর সমকালকে বলেন, জেলায় বিশ হাজার পঞ্চাশ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় ২৪৩ মে. টন জিআর চাল ও নগদ বারো লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে দ্বিতীয় দফা বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। ফলে চর, দ্বীপচর ও নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় জেলার ৪৪৮টি গ্রাম এখন বানের পানিতে ভাসছে। এসব গ্রামে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ২২ হাজার পরিবারের ৯০ হাজার মানুষ।

ধরলা পাড়ের সদর উপজেলা ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের নানকার, জগমোহনের চর, নন্দদুলালের ভিটা ও চর বড়াইবাড়ী ঘুরে দেখা গেছে, পানিতে তলিয়ে আছে বাড়িঘর। এ অবস্থায় সোমবার সকালে শুধু নানকার গ্রাম থেকে বাড়িঘর ছেড়ে কলাগাছের ভেলায় ছাগল-ভেড়া তুলে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে অর্ধশত পরিবার।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, কখনও ভারি এবং কখনও হালকা বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। সেইসঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে নদনদীগুলোর পানি উপচে পড়ছে। ফলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

এদিকে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাই সরকার জানান, বন্যার্তদের সহায়তায় সোমবার ১৬০ টন জিআর চাল, শুকনো খাবার বাবদ চার লাখ টাকা, শিশুখাদ্য বাবদ দুই লাখ টাকা এবং গো-খাদ্য বাবদ দুই লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

গাইবান্ধা : গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও তিস্তার পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব নদনদীর পানি এখন বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্রের পানি গতকাল সোমবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত বিপদসীমার ৬৭ সে. মি., ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ৩৭ সে. মি. এবং তিস্তার পানি বিপদসীমার ১৩ সে. মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব নদীর পানি নতুন করে আবার বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার নদী তীরবর্তী নিচু অঞ্চল এবং বিভিন্ন চর এলাকায় নতুন করে পানি উঠতে শুরু করেছে। ফলে ওইসব এলাকার মানুষ আবারও বন্যা আতঙ্কে নানা উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। এদিকে পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্ট হুমকির মুখে পড়েছে। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান জানান, ভাঙনের হুমকির কারণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কয়েকটি পয়েন্টে জরুরি প্রতিরক্ষামূলক কাজ শুরু করা হয়েছে।

ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) : ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ১৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করায় ইতোমধ্যে ওইসব গ্রামের মানুষ গবাদি পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে।

দ্বিতীয় দফার বন্যায় ফুলছড়ি উপজেলার সৈয়দপুর ঘাট থেকে বালাসীঘাট পর্যন্ত পুরোনো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করায় আবারও ভাষারপাড়া ও মাঝিপাড়া গ্রামের অনেক বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। এ কারণে এলাকার লোকজনকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বন্যার পানিতে গাইবান্ধা-বালাসী সড়কের আধা কিলোমিটার এলাকা আবারও তলিয়ে গেছে। এদিকে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপজেলার উত্তর উড়িয়া, রতনপুর, কাবিলপুর, ভাষারপাড়া, রসুলপুর, খলাইহাড়া, মাঝিপাড়া, ছাতারকান্দি, বাজে তেলকুপি, বুলবুলির চর, কাউয়াবাধা, উজালডাঙা, কৃষ্ণমণি, পূর্ব খাটিয়ামারী, জিয়াডাঙা, নামাপাড়া গ্রামের লোকজনের বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে।

সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি ফের বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। সোমবার সকাল ৬টায় সিরাজগঞ্জ জেলা পয়েন্টে বিপদসীমার তিন সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে যমুনার পানি প্রবাহিত হয়। অন্যদিকে জেলার কাজীপুর উপজেলা পয়েন্টে গত যমুনার পানি বিপদসীমার ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সিরাজগঞ্জের পাউবোর পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ (পওর) শাখার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি) এ. কে. এম. রফিকুল ইসলাম জানান, যমুনায় আগামী ৭২ ঘণ্টা পানি বাড়তে পারে। এদিকে, দ্বিতীয় দফা যমুনার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় জেলার সদর, কাজীপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি ও চৌহালী উপজেলার আভ্যন্তরীণ নদনদী ও এর শাখাগুলোতে পানি বাড়তে শুরু করেছে।

সুনামগঞ্জ : সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্ট দিয়ে সোমবার বিকেলে ৩টায় বিপদসীমার ২৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর পানি কূল উপচে প্রবেশ করায় সুনামগঞ্জ ও ছাতক পৌরসভার বেশিরভাগ এলাকাসহ জেলার সুনামগঞ্জ সদর, ছাতক, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর ও ধর্মপাশায় উপজেলার নতুন নতুন এলাকা বন্যাকবলিত হয়েছে। এই উপজেলাগুলোর কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি মানুষজন নিজেদের গৃহপালিত গরু-ছাগল নিয়েও বিপদে পড়েছে।

বেহেলী ইউনিয়নের আরশিনগর গ্রামের দেলোয়ার হোসেন বলেন, গরু-ছাগল নিয়ে কোথায় গিয়ে উঠব। আশ্রয়কেন্দ্রে গেলে বাড়ি দেখবে কে, নিজের খাওয়া, গরু-ছাগলে খাওয়া, এরপর আবার করোনা সংক্রমণের ভয়ও আছে। এ জন্য ঘরে হাঁটুসমান পানি নিয়েই বাস করছি। নিজেরা চৌকি উঁচু করে রান্নাবান্না ও ঘুমানোর ব্যবস্থা করলেও গরুগুলো তিনদিন ধরে পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।

এ ছাড়া সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর ভাঙনে জেলার দোয়ারাবাজার, দিরাই, শাল্লা ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নদী তীরবর্তী বাজার ও গ্রামগুলোয় ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

এ ছাড়া সড়ক ডুবে যাওয়ায় জেলার ছাতক, দোয়ারাবাজার, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, জগন্নাথপুর ও বিশ্বম্ভরপুরের সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানিয়েছেন, ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া আট লাখ টাকা ও ৩৪৫ টন চাল বন্যার্তদের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

ছাতক (সুনামগঞ্জ) : সুনামগঞ্জে ছাতকে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে বন্যার পানি নামছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। ফলে বন্যাদুর্গত এলাকায় বাড়ছে দুর্ভোগ। কিছু এলাকায় সরকারিভাবে শুকনো খাবার বিতরণ করা হলেও চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। স্থানীয় প্রশাসনের সরকারি হিসাব অনুযায়ী উপজেলার ১৩ ইউনিয়নের ৩১৫টি গ্রামের এক লাখ ১৬ হাজার ২৫০ জন মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।

এদিকে সোমবার ছাতক-দোয়ারাবাজার উপজেলায় বন্যাদুর্গত এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন সুনামগঞ্জ-৫ আসনের এমপি মুহিবুর রহমান মানিক।

গোলাপগঞ্জ ( সিলেট ) : গোলাপগঞ্জ উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সুরমা-কুশিয়ারার পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধির ফলে বাঘা, শরীফগঞ্জ, বুধবারীবাজার, বাদেপাশা,ঢাকা দক্ষিণ,লক্ষ্মণাবন্দ ও সদর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

উপজেলার পানিবন্দি এসব এলাকার রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।

ফেনী : ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে পাহাড়ি ঢল ও অতিবর্ষণে মুহুরী নদীর পাঁচ স্থানে বাঁধ ভেঙে ৮টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। বন্যার পানি ফেনী-পরশুরাম সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রোববার সন্ধ্যায় পানির চাপে বাঁধ ভেঙে যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন জানান, মুহুরী নদীর ফুলগাজী অংশের উত্তর দৌলতপুর ও পরশুরামের দুটি স্থানে বাঁধ ভেঙে যায়। ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জানান, ঢলের পানির তোড়ে ফুলগাজীর দৌলতপুর গ্রামে মুহুরী নদীর তিনটি স্থানে ও কিসমত ঘনিয়া মোড়া গ্রামে বাঁধ ভেঙে যায়। এতে ঘনিয়া মোড়া, কিসমত ঘনিয়া মোড়া, পূর্ব ঘনিয়া মোড়া, উত্তর দৌলতপুর, বৈরাগপুর, সাহাপাড়া, উত্তর বরইয়া গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পরশুরামের চিথলিয়া ইউনিয়নের দুটি অংশে মুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে ইউনিয়নের দুর্গাপুর, রতনপুর, রামপুর, দক্ষিণ শালধর, মালিপাথর ও পাগলীরকূল গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) : তিস্টত্মার পানি দ্বিতীয় দফা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরগঞ্জে ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফলে চরম কষ্টে দিনাতিপাত করছে চরবাসী। পানিবৃদ্ধি ও টানা ভাঙনে উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের উত্তর শ্রীপুর পুটিমারী, ভাটি কাপাসিয়া বাদামের চর, মাদারিপাড়া, লালচামার হরিপুর ইউনিয়নের মাদারিপাড়া, পাড়া সাধুয়া, বাংলা বাজার, কানিচরিতাবাড়ি গ্রামে হাজর একর ফসলি জমি ও হাজারও বসত বাড়ি নদীগভে বিলিন হয়ে গেছে।

ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) : ফুলবাড়ী উপজেলায় পাঁচটি ইউনিয়নে দুই হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নে বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছে ৭শ পরিবার। উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের পানিবন্দী গ্রাম গুলো মধ্যে রাঙ্গামাটি,খোচাবাড়ী, ভাঙ্গামোর,চরবড়লই,হামিদ মেম্বারে মোড় ওয়াবাধা বাজার,সুফিয়ারমোড়,বাঘ খাওয়ার চর,পশ্চিম ধনিরাম,পূূর্বধনিরাম, কবির মামুদ,প্রানকৃষ্ণ, জুৎকৃষ্ণ, জুতিন্দ্রনায়ান, চর শিমুলবাড়ী,পেঁচাই,গুয়াবাড়ী ঘাট, কান্ত্মাপাড়া, চরগোরল্ফম্নকমন্ড, নামাটারী,কৃষ্ণনান্দ বকসি খোকারচর।

সারিয়াকান্দি (বগুড়া) : সারিয়াকান্দিতে যমুনা ও বাঙ্গালী নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে দ্বিতীয় দফা বন্যায় উপজেলার চালুয়াবাড়ী, কাজলা, কর্ণিবাড়ী, বোহাইল, হাটশেরপুর, চন্দনবাইশা, কুতুবপুর,কামালপুর, সারিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও ন্নিাঞ্চল বন্যার পানিতে পস্নাবিত হয়েছে।উপজেলা প্রকল্প বাস্ববায়ন অফিস সুত্রে জানা গেছে, ৭১টি গ্রামের ১৪হাজার ৪৫০টি পরিবারের ৫৬হাজার মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে।

নেত্রকোনা : গত ক’দিন ধরে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার প্রধান নদী সোমেশ্বরী, উদ্ধাখালী, কংস, মগড়াসহ বিভিন্ন নদীর পানি বেড়ে নিন্মাঞ্চল পস্নাবিত হয়েছে। ওই সব নদ নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

এতে জেলার বারহাট্টা, আটপাড়া, কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, পূর্বধলা, মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুরী নিন্মাঞ্চল পস্নাবিত হয়ে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার গ্রামীন সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। মোহনগঞ্জ, বারহাট্টা, কলমাকান্দা, পূর্বধলা, দুর্গাপুর, আটপাড়া, সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অভ্যন্ত্মরীন সড়ক পানিতে ডুবে গেছে।

কলমাকান্দা (নেত্রকোণা) : কলমাকান্দায় বন্যা কবলিত এলাকায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সোমবার সকাল পর্যন্ত্ম উপজেলার উব্দাখালী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কলমাকান্দা, নাজিরপুর,পোগলা, বড়খাপন, খারনৈ, রংছাতি, লেংগুড়া ও কৈলাটী ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ৮টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামীণ কাঁচা-পাকা রাস্টত্মা-ঘাট তলিয়ে উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে।

মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ) : মেঘনার নদী ভাঙ্গনের মূখে কদমচাল ও লাউরার গ্রাম সহ নির্মানাধীন রাস্তা। বন্যার পানিতে দুটি ব্রিজের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। এছাড়া উপজেলার বেশিরভাগ রাস্টত্মা পানিতে ডুবে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) : বন্যার পানিতে ভেসে গেছে ধর্মপাশা উপজেলায় ৩৪২টি পুকুরে মাছ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কয়েকশ’ মৎস্যচাষী। উপজেলা মৎস্য কার্যালয় ও স্থানীয় মৎস্য চাষী সূত্রে জানা যায়, ধর্মপাশা উপজেলা সদর, সেলবরষ, পাইকুরাটি, মধ্যনগর, বংশীকুন্ডা দÿিণ ও বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের ৩৪২টি পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হয়। এ ছাড়াও ছোট বড় আরও ৭১৩টি পুকুরে প্রাকৃতিকভাবে মাছের সংরÿণ হয়। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় এসব পুকুরের মাছ ভেসে যায়।

ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) : গত বছর বন্যায়ও বাঁধটি ভেঙ্গেছিল। পস্নাবিত হয়েছিল ছোট বড় প্রায় ১৩টি গ্রাম। সেই সময় জনপ্রতিনিধি, জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ও স্থানীয় প্রশাসন বাঁধ পরিদর্শনে আসেন। স্থানীয় প্রশাসন শুস্ক মৌসুমে বাঁধটি মেরামত করার জন্য অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করে। স্থানীয়দের অভিযোগ বরাদ্দ দিলেও তেমন কাজ হয়নি। এ বছরও বাঁধটিতে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের জামুরিয়া ইউনিয়নের শংকরপুর এলাকায় ঝিনাই নদীর (পাড়) এ বাঁধটি ভেঙ্গে গেলে এ বছরও পস্নাবিত হবে উপজেলার পূর্ব অঞ্চল।

ইন্দুরকানী (পিরোজপুর) : কঁচা ও বলেশ্বরের অব্যাহত ভাঙনে পাল্টে যাচ্ছে ইন্দুরকানী মানচিত্র। দুটি নদীর ভাঙ্গন অব্যাহত থাকায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কয়েক হাজার একর ফসলি জমি এবং শতশত বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। উপজেলার পূর্ব চরবলেশ্বর, পূর্ব চন্ডিপর, কলারন, খোলপটুয়ার একাংশ,কালাইয়া, ঢেবসাবুনিয়ার কিছু অংশ, সাঈদখালি, চাড়াখালি গুচ্ছগ্রাম গ্রাম, লাহুরী, গাজীপুর ও টগড়া ফেরিঘাট এলাকায় বর্তমানে ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে।