প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে

উন্নয়ন ডেস্ক –

জুলাই ০৯, ২০২০

এক দুধকালে একটি গাভী গড়ে আড়াই হাজার কেজি দুধ দেয়। এটি বৈশ্বিক গড়। কিন্তু বাংলাদেশে একটি গাভী দুধ দেয় গড়ে ২০৫ কেজি। একই অবস্থা মাংসের উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রেও। সারা বিশ্বে যেখানে প্রতিটি গরু থেকে গড়ে ২২০ কেজি মাংস উৎপাদন হয়, সেখানে বাংলাদেশে পাওয়া যায় ৭২ কেজিরও কম।

শুধু দুধ বা মাংস উৎপাদন নয়, প্রাণিসম্পদ খাতের প্রায় সব ক্ষেত্রেই উৎপাদনশীলতায় বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে উন্নত দেশ তো বটেই, এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়েও উৎপাদনশীলতা কম বাংলাদেশের।

বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নত জাত না আসায় গাভীর দুধ উৎপাদন সক্ষমতা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। একই কারণে পিছিয়ে দুধ-মাংসের উৎপাদনশীলতাও। শুধু ভালো জাত না থাকার কারণে বেশি পরিমাণে খাদ্য দিয়েও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ দুধ ও মাংস পাওয়া যাচ্ছে না। উন্নত বিশ্বে যেখানে সাড়ে তিন থেকে চার কেজি খাদ্য দিলে এক কেজি মাংস উৎপাদন করতে সক্ষম, সেখানে বাংলাদেশের গরুকে দিতে হয় সাত থেকে সাড়ে আট কেজি খাদ্য। এতে খরচ বাড়লেও সে অনুযায়ী লাভবান হতে পারছেন না খামারিরা।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএলআরআই) সাবেক মহাপরিচালক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, সারা বিশ্বে প্রাণিসম্পদ খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার যে হারে এগিয়েছে তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি বাংলাদেশ। আমাদের কৃষক ও খামারিরা প্রযুক্তি বাস্তবায়নে পরিপূর্ণ দক্ষ না হলেও প্রযুক্তি গ্রহণে খুব আগ্রহী। কিন্তু আমরা সেই প্রযুক্তি দিতে পারছি না। বিশেষ করে পশুর জাত উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে গেছি। এখনো প্রাচীন একটি ব্রিড নিয়েই গরু মোটাতাজা করে যাচ্ছি। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও খাদ্যের মানে রয়েছে অনেক ঘাটতি। পশুগুলো এখনো পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না। আবার একজন পশু চিকিৎসক বা ডাক্তারকে কয়েক লাখ পশু-প্রাণীকে সেবা দিতে হয়। ফলে সেবার মানে থেকে যাচ্ছে ঘাটতি। ফলে উন্নত ব্রিড না থাকা, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবার মানে পিছিয়ে থাকার কারণেই প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি।

প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদনেও। এফএওস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিটি গরু থেকে গড় মাংস উৎপাদন হচ্ছে ৭১ দশমিক ২০ কেজি, যেখানে বৈশ্বিক গড় ২১৯ দশমিক ৩৬ কেজি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে ১৯৬ কেজি, শ্রীলংকায় ১৩৭ কেজি এবং ভারতে ১০৩ কেজি মাংস উৎপাদন হয় প্রতিটি গরু থেকে।

দেশে প্রতিটি ছাগল থেকে গড়ে সাত কেজি করে মাংস পাওয়া গেলেও এক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড় ১২ দশমিক ৩২০ কেজি। যদিও আফগানিস্তানে একটি ছাগল থেকে গড়ে ১৩ কেজি, শ্রীলংকায় ২০ কেজি এবং পাকিস্তানে ১৭ দশমিক ১৮ কেজি মাংস পাওয়া যায়।

অন্যদিকে দেশে প্রতিটি মুরগির মাংস দিচ্ছে গড়ে এক কেজির নিচে বা প্রায় ৭০০ গ্রাম, যেখানে বৈশ্বিক গড় ১ কেজি ৬৪০ গ্রাম। আবার প্রতিটি হাঁস থেকে মাংস পাওয়ার বৈশ্বিক গড় ১ কেজি ৪৯০ গ্রাম হলেও বাংলাদেশে পাওয়া যায় প্রায় এক কেজি।

ডিমের ক্ষেত্রেও অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে প্রতিটি মুরগি গড়ে ২ দশমিক ১৯ কেজি ডিম দেয়। যদিও এক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড় ১০ দশমিক ৪ কেজি। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারতে একটি মুরগি থেকে প্রায় ১৩ কেজি এবং শ্রীলংকায় ১২ দশমিক ২২ কেজি ডিম পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে এসিআই অ্যানিমেল হেলথের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ফা হ আনসারী বলেন, মাংস ও দুধের উৎপাদনশীলতার সঙ্গে খামারিদের খরচ কমানোর একটি সম্পর্ক রয়েছে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানো গেলে কম খরচে ভোক্তাকে দুধ ও মাংস সরবরাহ সম্ভব হবে। তখন খামারিরাও লাভবান হতে পারবেন। কিন্তু গরুর জাত উদ্ভাবনে দেশে ৩৫ বছরের আগের সেই ব্রিড নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। অনেক পশুই এখন ইনব্রিড শুরু হয়ে গেছে। আর এ কারণেই মাংস বা দুধ উৎপাদনক্ষমতা কমে গেছে। অথচ উন্নত বিশ্বে জাত উদ্ভাবনে প্রতিনিয়তই গবেষণা এবং নতুন নতুন সিমেন দিচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি অ্যামব্রায়ো সম্প্রসারণ করছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। আবার দুধ ও মাংস বিপণনের ক্ষেত্রে খামারিদের নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না। খাদ্য সরবরাহে যেমন সংকট রয়েছে, তেমনি খামারি পর্যায়ে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিও রয়েছে। ফলে খামারিদের আরো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

দুধ: গরুর দুধের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এখানে প্রতিটি গরু গড়ে ২০৫ দশমিক ৩২ কেজি দুধ দিচ্ছে। যদিও এক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড় ২ হাজার ৪৪৯ দশমিক ১২ কেজি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতে প্রতিটি গরু গড়ে ১ হাজার ৫৮৮ কেজি, পাকিস্তানে ১ হাজার ২৩০ কেজি, ভুটানে ১ হাজার ৩৮৬ কেজি এবং শ্রীলংকায় প্রায় ৯৭৮ কেজি দুধ দিচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রতিটি ছাগল দুধ দিচ্ছে ৩৮ দশমিক ২৮ কেজি। যদিও বৈশ্বিক গড় ৮৬ দশমিক ৭০ কেজি। ভারতের ছাগল দিচ্ছে প্রায় ১৬৭ কেজি দুধ।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) কেন্দ্রীয় মহাসচিব মো. শাহ এমরান মিডিয়াকে বলেন, ভারতের একজন খামারি প্রতিটি গাভী থেকে ২০ কেজির বেশি দুধ পাচ্ছেন। আর আমরা পাচ্ছি মাত্র ছয়-আট কেজি। আবার ওরা উৎপাদনে কম খরচ করলেও আমাদের দ্বিগুণের বেশি খরচ করতে হচ্ছে। ফলে খামারিরা কোনোভাবেই দুগ্ধ শিল্পে লাভবান হতে পারছেন না। এর পেছনে সরকারের নীতিসহায়তার ভীষণ দুর্বলতা রয়েছে। দেশে দুধের উৎপাদন বাড়তির দিকে থাকলেও আমদানিকে অবারিত করে রাখা হয়েছে। ফলে খামারিরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। আবার উন্নত গাভীর জন্য সিমেন আমদানি বা অ্যামব্রয়ো পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করা হচ্ছে না। অন্যদিকে খামারিদের এখনো বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল ও জমির খাজনা দিতে হচ্ছে বাণিজ্যিক রেটে। ফলে তারা উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়াতে পারছেন না, তেমনি খরচও কমাতে পারছেন না। উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণনসহ প্রক্রিয়াকরণের প্রতিটি পর্যায়ে এখনো পদক্ষেপ না নিলে দেশের দুগ্ধ খাত আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ৪০ কোটি ২৫ লাখ ৬৩ হাজার গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি উৎপাদন হয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩৯ কোটি ৩১ লাখ ৩১ হাজার। উৎপাদনশীলতা ভালো না থাকার কারণে প্রাণিসম্পদের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি খুব বেশি জোরালো হচ্ছে না। দেশের খামারিরা প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি ৬৮ লাখ পিস ডিম উৎপাদন করছেন। ডিমের মোট উৎপাদনে ভালো উল্লম্ফন থাকলেও এখানেও ঘাটতি রয়েছে উৎপাদনশীলতায়। চাহিদার সমান মাংসের উৎপাদন হলেও দুধের ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৫৩ লাখ টন। ঘাটতির কারণে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ হাজার ৮২১ কোটি টাকার দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি হয়েছে।