বঙ্গবন্ধু টানেলের দ্বিতীয় সংশোধনী যাচ্ছে একনেকে : মেয়াদ বাড়ছে এক বছরের

উন্নয়ন বার্তা ডেস্ক:
কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিতব্য টানেলের পূর্তকাজ প্রায় শেষের পথে। চলতি মাসেই এটি উদযাপন করবে সেতু কর্তৃপক্ষ। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যান চলাচলও উন্মুক্ত করা হবে। তবে আনুষঙ্গিক কাজের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে ১৬৮ কোটি টাকা।

২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের পতেঙ্গা প্রান্তের প্রথম টানেল টিউবের বোরিং কাজ উদ্বোধন করেন। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের ১২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় টানেল টিউবের বোরিং কাজের উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

বর্তমানে টানেল প্রকল্পের ৯৩ শতাংশের বেশি ভৌতকাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে মূল পূর্তকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২৬ নভেম্বর পূর্তকাজ সমাপ্তি উদযাপন করবে সেতু কর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রকল্পটিতে বেশকিছু নতুন কাজ সংযুক্ত করা, কভিডের কারণে বিলম্বিত হওয়ায় প্রকল্পটির কাজ শেষ হলেও মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

২০১৫ সালে বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণের মূল প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে একই বছর প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা করা হয়। ওই সময়ে মেয়াদ ২০২০ সাল থেকে বাড়িয়ে ২০২২ সাল করা হয়। সর্বশেষ দ্বিতীয় সংশোধনীতে বঙ্গবন্ধু টানেলের মেয়াদ ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। দ্বিতীয় সংশোধনী অনুযায়ী ২০২২ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সর্বশেষ চলতি মাসের প্রথম দিকে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। এরই মধ্যে এটি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটিতে পাস হয়েছে। চলতি মাসের শেষদিকে অথবা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে একনেকে উঠবে।

এ-সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা গিয়েছে, দ্বিতীয় সংশোধনীর মূল কারণগুলো হলো দ্রব্যমূল্য পরিবর্তনের জন্য মূল্য সমন্বয়, কাজের পরিধি পরিবর্তন, কনসেশনাল ঋণ চুক্তির সমন্বয়, সার্ভিস এরিয়ার তৈজসপত্র, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, আসবাবপত্র এবং গৃহসজ্জা সামগ্রী ক্রয়, নতুন আইটেম সংযোজন, নতুনভাবে পুলিশ ক্যাম্প এবং ফায়ার স্টেশন নির্মাণ, বোট কেবিন ক্রজারের বরাদ্দ বাতিল, মুদ্রার বিনিময় হার হ্রাস-বৃদ্ধি, ভ্যাট ও আইটির হার বৃদ্ধি। তবে প্রকল্পের মেয়াদ ও কার্যপরিধি বৃদ্ধি ছাড়াও কিছু ক্ষেত্রে কাজের পরিধি কমানো বা বাতিল করা হচ্ছে।
ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে প্রস্তাবে বলা হয়েছে, টানেল অ্যাপ্রোচ কাজে ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে ৫৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা, ভ্যাট ও আইটি খাতে ব্যয় বাড়ছে ২১০ কোটি ৭২ লাখ ৭ হাজার, ঋণচুক্তি অনুযায়ী ১১ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলারের একচেঞ্জ রেট-সংক্রান্ত কারণে ব্যয় বাড়ছে ১০৬ কোটি ১৮ লাখ ৫ হাজার, পুলিশ স্টেশন ও ফায়ার স্টেশন খাতে ১৫ কোটি, সার্ভিস এরিয়ার ফিট আউট খাতে ৩০ কোটি, মূল টানেল খাতের পণ্য আমদানি ও এক্সচেঞ্জ রেট-সংক্রান্ত কারণে ব্যয় বাড়ছে ৪১ কোটি ৩৭ লাখ ৪২ হাজার, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি (১ শতাংশ) ১০৩ কোটি ৮৭ লাখ ৪৪ হাজার, ইলেকট্রিক্যাল ইকুইপমেন্টে ৯৭ লাখ ৮২ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের সর্বশেষ কাজের জন্য ব্যয় বাড়ছে ৫৬৭ কোটি ২৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা।

অপরদিকে ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় কমছে ১০১ কোটি ৫৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা, ফিজিক্যাল কনটিনজেন্সিতে (শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ) ৪৩ কোটি ৯৮ লাখ ৯১ হাজার, সিডি ভ্যাট খাতে ১২৬ কোটি ৩২ লাখ ৮০ হাজার, বোট কেবিন ক্রজারে ২ কোটি ২০ লাখ, পরামর্শক খাতে ১৫ কোটি ১৭ লাখ ৪৭ হাজার, ভাতা খাতে ৬ কোটি ৬৩ লাখ ৮২ হাজার, কস্ট ফোরকাস্টিং খাতে ৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ২৭ হাজার এবং অন্যান্য খাতে ব্যয় কমছে ১৬ কোটি ৬৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩৯৮ কোটি ৪৬ লাখ ৭১ হাজার টাকা ব্যয় কমছে। এ হিসাবে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনীতে নিট ব্যয় বাড়ছে ১৬৮ কোটি ৮৩ লাখ ১০ হাজার টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক হারুনুর রশীদ চৌধুরী মিডিয়াকে বলেন, টানেল নির্মাণ একটি জটিল প্রকল্প হওয়ায় কভিড-১৯ সংকটের পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শতভাগ পূর্তকাজ শেষ করা হয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রকল্পটি যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। পূর্তকাজ শেষ হলেও শুরুতে প্রকল্পে না থাকা বেশকিছু কাজ যুক্ত করতে হচ্ছে। ঋণচুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও দেশীয় ঠিকাদারসহ বিভিন্ন কাজে সময়ক্ষেপণ হয়। এজন্য প্রকল্পটির মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হচ্ছে। তবে ব্যয় বাড়লেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু করে দেয়া হবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কভিডের কারণে ২০২০ সালে চীন থেকে উপকরণ আমদানি বিঘ্নিত হয়। যার কারণে প্রকল্পের ভৌতকাজ কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছিল। টানেল বোরিং কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হলেও চলতি বছরের শুরুতে চীন থেকে সাজসজ্জাসহ ফিনিশিং কাজের উপকরণ আসতে বিলম্ব হয়েছে। তাছাড়া প্রকল্পের উভয় প্রবেশ মুখে স্ক্যানার বসানোর পরিকল্পনা যুক্ত করায় প্রকল্পটির কাজ বিঘ্নিত হয়েছে বেশি। দেরিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ায় ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতায় প্রকল্পের শতভাগ কাজ এবং যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়াও বিলম্বিত করছে। এ কারণে ঋণচুক্তির মেয়াদ শেষ পর্যায়ে চলে আসায় প্রকল্পের বাকি কাজের মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই বলে মনে করছেন তারা।

সেতু কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে মিডিয়াকে বলেন, টানেল নির্মাণ প্রকল্পটি সেতু কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন করলেও মাঠ পর্যায়ের সরকারি একাধিক সংস্থার সঙ্গে টানেলের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও টানেলের মূল কাজ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী শেষ হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সংযোগকারী বিভিন্ন প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি ধীর। তাছাড়া বিলম্বে স্ক্যানার বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়ায় ভূমি নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে পূর্ণাঙ্গ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রয়োজনে আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।

চীনা অর্থায়নে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিতব্য টানেল প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসাবে নিয়োগ পেয়েছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি)। ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪২ লাখ ৪০ হাজার টাকার এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০১৫ সালের ৩০ জুন। ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পাঁচ বছর অর্থাৎ ১ হাজার ৮২৬ দিনের মধ্যে ২০২২ সালের ৪ ডিসেম্বর কাজ শেষ করার কথা রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। এরপর দুই বছর ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড রয়েছে চুক্তিতে। চুক্তিতে মূল টানেলের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০৫ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ডলার, প্রভিশনাল সামের জন্য ৬৪৬ মিলিয়ন ডলার, সার্ভিস এরিয়ায় ৫৯ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ডলার, ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারে ৩ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার ও টাগবোটের জন্য ৯ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার চুক্তি করা হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।

এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া মিডিয়াকে বলেন, সড়ক কিংবা সেতুর চেয়ে একটি টানেল সবচেয়ে বেশি স্পর্শকাতর স্থাপনা। সেতু কর্তৃপক্ষ কার্যক্রম শুরুর অনেক পর সরকারি বিভিন্ন সংস্থা টানেল ব্যবহারের সংযোগকারী প্রকল্পগুলো হাতে নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণের কাজ শেষ হলেও অনেক বাহ্যিক প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না, যা টানেল নির্মাণ এলাকায় সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে বিশৃঙ্খল করে তুলবে। মূল টানেলের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে এলেও অপরাপর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করতে মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি খুবই হতাশাজনক। স্থানীয় সংস্থাগুলোর উচিত দ্রুত সময়ের মধ্যে সংযোগকারী অবকাঠামো নির্মাণকাজ শেষ করা।