বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের

উন্নয়ন ডেস্ক –

জুলাই ১৯, ২০২০

২০১৯-২০ অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব একটি বার্ষিক কর্মসম্পাদনের চুক্তি করেন। সেই কর্মসম্পাদন চুক্তিতে বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান বা ব্যবস্থাপনার ওপর সরকারের সীমিত নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনায়ও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হলেও নেয়া হয়নি কার্যকর কোনো উদ্যোগ। ফলে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের কোনো নিয়ন্ত্রণই প্রতিষ্ঠিত হয়নি এখন পর্যন্ত, যার প্রমাণ মেলে চলমান কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ভূমিকা ও নানা দুর্নীতির ঘটনায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকার বড় কারণ বিদ্যমান আইন। ৩৮ বছরের পুরনো অধ্যাদেশেই চলছে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো। ১৯৮২ সালে প্রণীত ‘বাংলাদেশে দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স’-এর আওতায় দেশের বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। অধ্যাদেশটি যখন করা হয়েছিল, তখন দেশে হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ছিল। বর্তমানে তার অবয়ব বেড়েছে কয়েক গুণ। অথচ এত বছরেও বেসরকারি খাতের চিকিৎসাসেবার জন্য আইন যুগোপযোগী করা হয়নি। যুগোপযোগী নীতিমালা না থাকায় বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও লাগামহীনতা বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। গত কয়েক বছরে এ-সংক্রান্ত আইন তৈরির উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি’র যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সেটি পুরোপুরি চালু হলে বেসরকারি হাসপাতালের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা কমত। কিন্তু সে উদ্যোগও বাস্তবায়ন হয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা মুজাহেরুল হক এ প্রসঙ্গে মিডিয়াকে বলেন, বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানে সরকারের তদারকি বাড়াতে হবে। শুধু অনুমোদন দিয়েই দায়িত্ব শেষ করলে হবে না। সেই অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিনা সেই বিষয়টিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশ দিয়ে এ সময় বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা পরিচালিত হতে পারে না। ওই অধ্যাদেশে বিধান লঙ্ঘন হলে শাস্তি হিসেবে ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের জেলের কথা উল্লেখ আছে। এ সময়ের বিবেচনায় অবশ্যই এসব বিধান পরিবর্তন করে এ খাতের জন্য আইন যুগোপযোগী করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৬৫৪। আর বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৫ হাজার ৫৫। তবে সারা দেশে এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অনিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে। সেসব হাসপাতালের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় না। আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এসব হাসপাতালের বিষয়ে তদারকিও দুর্বল।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) করা এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, সর্বশেষ খানা জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশে ৭৭ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে সেবা গ্রহণ করে। দেশে ৬৯টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও প্রায় ৫ হাজার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক থাকলেও নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তের চিকিৎসায় তাদের ভূমিকা কী হবে বা তারা কীভাবে চিকিৎসাসেবা প্রদান করবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রণয়ন ও সমন্বয় করা হয়নি। কোনো ধরনের নির্দেশনাও প্রদান করা হয়নি। প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন করোনা চিকিৎসায় তাদের প্রস্তুতির দাবি করলেও এ বিপর্যয়ের সময় অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তারা অন্যান্য চিকিৎসাসেবাও বন্ধ করে দিয়েছে, যা বিপুলসংখ্যক মানুষের দুর্ভোগ ও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সব বেসরকারি হাসপাতালকে একাধিকবার করোনা আক্রান্তের চিকিৎসা প্রদানের নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকির ঘাটতি ছিল।

জানতে চাইলে বেসরকারি খাতের চিকিৎসাসেবা পরিচালনার আইন যুগোপযোগী করার কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সব ধরনের উদ্যোগই নেয়া হবে।