জুন ১৩, ২০২৪

আমাদের সম্পর্কে আরো জানুনঃ

সরবরাহকৃত পানি সুবিধার বাইরে ৮৫% মানুষ

উন্নয়ন ডেস্ক –

দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশ ভুটান। আয়তন ও অর্থনৈতিকভাবে ছোট হলেও নাগরিকদের পরিশোধিত পানির প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য নেই দেশটির। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন বলছে, ভুটানের ৯৯ শতাংশের বেশি মানুষ পাইপলাইনে সরবরাহ করা পরিশোধিত পানি পাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশে এখনো পরিশোধিত পানি সুবিধার আওতায় রয়েছে মাত্র ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ।

বিশ্বব্যাংক তাদের ওই প্রতিবেদনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পানি সরবরাহ, গুণগত মান এবং দাম নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে। সেখানে পাইপলাইনে সরবরাহকৃত পানির বিষয়ে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সরবরাহকৃত পরিশোধিত পানি প্রাপ্তির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভুটান। দেশটির ৯৯ শতাংশের বেশি মানুষ সরবরাহকৃত পানি সুবিধা পায়। অন্যদিকে মালদ্বীপে ৪৭ দশমিক ৮০ শতাংশ, নেপালে ৪৭ দশমিক ৪০ শতাংশ, ভারতে ৪৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৩৮ দশমিক ২৮ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও আফগানিস্তানে ২১ দশমিক ৬৭ শতাংশ মানুষ পাইপলাইনে সরবরাহ করা পানি সুবিধার আওতায় রয়েছে।

জনগোষ্ঠীর পাইপলাইনে পানি সুবিধা প্রাপ্তির তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার নিচে রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান।

দেশে মাত্র ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ এ সুবিধার আওতায় আছে। এক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে পার্থক্যও বেশ। শহরের প্রায় ২২ দশমিক ৬৬ শতাংশ মানুষ পাইপলাইনে পরিশোধিত পানি পেলেও গ্রামে এ হার মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নিরাপদ পানি সরবরাহের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ বিষয়ে সুস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু এত কমসংখ্যক মানুষ নিরাপদ পানি সুবিধার আওতায় থাকলে সেসব লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ওয়াটার এইড বাংলাদেশের সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর এবং বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক মো. খায়রুল ইসলাম এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, নেপাল ও আফগানিস্তানের তুলনায় আমাদের পিছিয়ে থাকাটা দুর্ভাগ্যজনক। এটি প্রেস্টিজ ইস্যু, পিছিয়ে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকার যদি রাজনৈতিকভাবে কোনো টেকসই অঙ্গীকার না নেয়, তাহলে দেশের মানুষের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছানো খুব কষ্টসাধ্য হবে। ভারতে এরই মধ্যে প্রতিটা ঘরে পাইপলাইনে পানি যাবে এমন অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। সব দেশেরই নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন দরকার। আমাদের দেশে কিছুটা পরিকল্পনা করা হচ্ছে, কিন্তু সেটি একেবারেই শহরকেন্দ্রিক। ফলে পানি নিয়ে শহর ও গ্রামে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি করছি আমরা। আবার সরবরাহকৃত পানির মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন ও জটিলতা। মহামারী পরিস্থিতিতে হাত ধোয়ার যে প্রচলন আমরা দেখছি, সেটিও সরবরাহকৃত পানি ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে ২২৫ কোটি থেকে ২৩০ কোটি লিটার পানির প্রয়োজন। আবার ওয়াসা যে পানি সরবরাহ করছে, তার ২২ শতাংশ ভূূ-উপরস্থ উৎস থেকে এবং ৭৮ শতাংশ ভূ-গর্ভস্থ উৎস থেকে উৎপাদন করা হচ্ছে। ‘জাতীয় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন নীতিমালা, ১৯৯৮ অনুযায়ী’ সমগ্র দেশের পল্লী এলাকায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক নিরাপদ পানির উৎস স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সবার জন্য নিরাপদ সুপেয় পানি সরবরাহ করা, স্যানিটারি ল্যাট্রিন সুবিধাভোগী নগরবাসীর অনুপাত ১০০ শতাংশে এবং গ্রামীণ জনগণের অনুপাত ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। সেই লক্ষ্যে সারা দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নয়নের পরিকল্পনায় সম্প্রতি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। চলতি বছরের শুরুতে সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ শীর্ষক প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৮৫০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এজন্য সারা দেশে ৯০ হাজার ৬৩৬টি অগভীর নলকূপ এবং ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৭৭টি গভীর নলকূপ স্থাপন হবে। সাবমার্সিবল পাম্প ও জলাধারসহ অগভীর নলকূপ ২ লাখ ৬ হাজার ৬৬৪টি এবং সাবমার্সিবল পাম্প ও জলাধারসহ গভীর নলকূপ হবে ১ লাখ ৭০ হাজার ২২২টি। এছাড়া অন্যান্য যন্ত্র স্থাপনের মাধ্যমে গ্রামে পানি সরবরাহ বাড়ানো হবে। এদিকে শহরে পানি সরবরাহ বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নে রয়েছে ধীরগতি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ও মাঝারি শহর অঞ্চল এবং সেসব শহরে বস্তিতে বসবাসকারীদের পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ বাড়াতে হবে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে পারলে নারীদের পানি সংগ্রহ সহজ হবে। শিশুরা পানিবাহিত রোগ থেকে দূরে থাকতে পারবে। ফলে তাদের স্কুলে উপস্থিত নিশ্চিত হবে। তাছাড়া এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Pinterest
Reddit